উজান ধলে, সবুজের সমুদ্রে

উজান ধলে, সবুজের সমুদ্রে

সবুজের সমুদ্র!

মাঝখানে ছোট্ট পাকা সড়ক আর দুপাশে আদিগন্ত সবুজ ধানের সমারোহ। আদিগন্ত মানে একেবারেই দিগন্ত পেরিয়ে, যতোদূর দৃষ্টি যায়। ঠিক এরকম জায়গায় দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে্র মুহুর্তে কবি পলাশ দত্ত বিস্ময়ে উচ্চারন করেন।

পলাশ এবং আরেকজন এসেছিলেন ঢাকা থেকে। সিলেট থেকে আমরা তিনজন, সুনামগঞ্জ থেকে কল্লোল ও শামস শামীম। সিলেট থেকে রওয়ানা দিয়েছিলাম দুপুর বেলা। মার্চের ৪ তারিখে প্রকৃতি যেমন থাকার কথা, ঠিক সেরকম নয়। অবশ্য সিলেট তো এমনই, নয়তো ফাল্গুন মাসে বৃষ্টি আর বাতাস!

আমরা যাচ্ছিলাম সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে। মরমী শিল্পী শাহ আব্দুল করিমের গ্রাম। তাঁর ১০১ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে উজান ধলের মাঠে বসেছিলো মেলা ও বাউল গানের আসর। প্রথম দিন যাওয়া যায়নি, আমরা পরিকল্পনা করি দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার।

দক্ষিন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ বাজারে ছোট্ট বিরতি নেই আমরা। এনামুল কবির আর শাহজাহান ভাইয়ের সাথে আড্ডা হয় সাথে গরম গরম পরোটা আর মিষ্টি। শান্তিগঞ্জ বাজারে বসেই টের পাই আরো বেশ দূরের উজান ধল গ্রামের আইয়োজনের লোকপ্রিয়তা। একজন স্থানীয় প্রৌঢ় জানান কাল সারারাত ধরে গান বাজনা হয়েছে, তিনি ছিলেন। সকালে এসেছে, সন্ধ্যায় আবার যাবেন।

সিলেট থেকে ঘন্টাদেড়েক সুনামগঞ্জ রোড ধরে ছুটি আমরা, রাস্তা চমৎকার। সুনামগঞ্জ শহরে ঢোকার ১০ কিমির আগে হাতের বামে দিরাই’র রাস্তা ধরি এবার। ২৫ কিমি এর মতো, কালনী নদীর পাড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে রাস্তা। রাস্তার অবস্থা ভালো না, এক ঘন্টা লেগে যায় দিরাই বাজার পৌঁছাতে। বাজারের ভেতর সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি উজান ধলের সড়কে। ব্যস্ত ঘর বসতির মোড় পেরিয়েই আমাদের জন্য বিস্ময়! সবুজের সমুদ্র...

এখান থেকেই মুলতঃ হাওরের শুরু। বর্ষার শুরু থেকে পরের কয়েক মাস জলমগ্ন থাকে চারদিক। ঢেউ উঠে, নৌকা চলে। পানি নেমে যাওয়ার পর আবার জেগে উঠে হাওরের বুক চিড়ে বানানো সামমার্সিবল পাকা সড়ক। সড়কের অবস্থা বেশ ভালো। সড়কের দু পাশ ধরে কেবল ধান আর ধান, এখন সবুজ- বৈশাখ মাসে হয়ে উঠবে সোনালী। সবুজের সামনে দাঁড়িয়ে সেই আদিগন্ত সোনালী কল্পনা করি। হাওরের এই সৌন্দর্য বর্ননাতীত। দিরাই উপজেলার সিমানা পেরিয়ে শাল্লা, সুনামগঞ্জ জেলার সীমানা পেরিয়ে নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ- বর্ষায় পানি আর পানি, তারপর সবুজ, আরো পরে সোনালী। বারবার ফিরে আসতে হয় এই সুন্দরের কাছে।

মিনিট বিশেক চলার পর আমরা পৌঁছে যাই উজান ধলের মাঠে, তখন সন্ধ্যা হতে যাচ্ছে। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত এখানে বৃষ্টি আর প্রবল বাতাস ছিলো। মেলার দোকানপাট আর মাঠের মাঝখানের অনুষ্ঠান প্যান্ডেল সব লণ্ডভন্ড হয়ে গেছে। এখন বৃষ্টি নেই, দোকানীরা আবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, প্যান্ডেল ও বাঁধা হচ্ছে আবার।

আমরা মেলার মাঠে ঘুরে ঘুরে দেখি, মানুষ দেখি, সওদা পাতি দেখি। আশে পাশের গ্রামগুলো থেকে, দূর থেকে মানুষেরা এসেছেন। নারীরা এসেছেন মেলায়- হিন্দু মুসলমান সবাই। প্রায় শতবর্ষী বৃদ্ধ এসেছেন লাঠিতে ভর করে। কথা বলি তার সাথে, বলেন- নদীর ঐ পাড়ে ধলের মেলা বহু পুরনো, তাদের ছোটবেলায় ও ধলের মেলা বসতো। এখনো ফাল্গুন মাসে হয় ধলের মেলা, কয়দিন আগে হয়েছে। আর এটা উজান ধল।

একদিকে লাঠি বিক্রি হচ্ছে। পাকানো লাঠি, হাওরাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো মানুষের অতি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার সংগী। মেলা জুড়ে নানা খাবারের আয়োজন- নাগা মরিচ দেয়া ঝাল মুড়ি চানাচুর, স্থানীয় ভাবে বানানো মিস্টি, গরম গরম তেলের পিঠা, চটপটি ফুচকা আর চিড়া মুড়ি খই নকুল দানা- সব আছে। মিস্টি এতোই সুস্বাদু, গোতা কয়েক খেতেই হবে ।

তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। স্থানীয় আয়জকেরা অনুরোধ করেন শাহ আব্দুল করিমের বাড়িতে যেতে। অন্ধকারে আমরা গ্রামের পথ ধরে পায়ে হেঁটে তাঁর বাড়ি পৌঁছাই। দেখা হয় তাঁর পুত্র নূর জালাল আর প্রিয় শিষ্য আব্ধুর রহমানের সাথে। আব্দুর রহমান বড় দরদী গলায় গান তার মুর্শিদের গান। ছিমছাম সাধারন বাড়ি তাঁর। বাড়ির আঙ্গিনায় শুয়ে আছেন শাহ আব্দুল করিম আর তারঁ সাধন সংগীনি স্ত্রী সরলা। মেলায় আগত বহু মানুষ আসছেন বাড়িতে, তাদের সকলের জন্যই রয়েছে আপ্যায়নের ব্যবস্থা। আমরা ও শিরনি খাই- আখনি । বাউল লাল মিয়া আর কবি মেকদাদ আমাদের সংগ দেন। বাড়ির সামনে শাহ আব্দুল করিম স্থাপিত সংগীতালয়। সেখান থেকে ভেসে আসা তার গানের সুর। আমরা এগিয়ে যাই।

শাহ আবদুল করিমের আরেক শিষ্য রণেশ ঠাকুরকে ঘিরে বসেছে মজমা। রণেশ সুরের নেশায় বুঁদ হয়ে গাইছেন তার মুর্শিদের গান একের পর এক। ‘আমার বন্ধু দয়াময়, তোমারে দেখিবার মনে লয়’ থেকে শুরু করে ‘ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ হয়ে ‘ বন্ধে মায়া লাগাইছে, পিরীতি শিখাইছে’ চলতে থাকে রনেশের সুরের জাদু। বড় মায়াময়, মাটি থেকে উঠে আসা এই সুরের নেশা। এখানে কোন অলংকার নেই, অতিরিক্ত কিছু নেই, নেই সাজসজ্জা। হারমোনিয়াম বাজিয়ে একাই গাচ্ছেন রণেশ, একজন একতারা আরেকজন ঢপকিতে সংগ দিচ্ছেন। ধোঁয়া উড়ছে রহস্যময়। সুরের এই রহস্য থেকে বের হয়ে আসা বড় কঠিন। আমরা সকলে সেই মজমায় বসে থাকি।

অনেক পরে যখন উঠে এসে আমরা আবার মেলার মাঠে হাজির হই তখন প্রায় মাঝরাত। মেলা জমে উঠেছে। আকাশে ও মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। প্যান্ডেলে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের সাথে চলছে মরমীয়া আব্দুল করিমের গান। রণেশ ঠাকুরের সহজিয়ায় আমরা বুঁদ হয়ে আছি তখন, আমাদেরকে আর টানেনা ডিজিটাল সিস্টেম, আলোকসজ্জা।

আমরা চুপচাপ বসে থাকি অনেকক্ষন, হাওরের বাতাস এসে লাগে গায়। শেষ রাতে যখন সিলেট ফেরার পথ ধরি আমাদের মাথার ভেতর তখনো সবুজের সমুদ্র, উজান ধল গ্রাম আর শাহ আব্দুল করিমের গান ‘ রংয়ের দুনিয়া তরে চাইনা’

সিলেট বেড়াতে আসা যে কেউ চাইলে একদিনের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন শাহ আব্দুল করিমের উজান ধল গ্রাম বেড়িয়ে আসার। বর্ষার আসার আগ পর্যন্ত সরাসরি গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে। সময় লাগবে ঘন্টা তিনেক। বর্ষায় দিরাই পর্যন্ত গাড়ি, তারপর নৌকা। খুবই আন্তরিক এই গ্রামের মানুষ। হয়তো সুযোগ হয়ে যেতে পারে শাহ আব্দুল করিমের বাড়ির আঙ্গিনায় বসে তাঁরই কোন শিষ্যের কন্ঠে শুনা প্রকৃত সুরের গান , পাশ দিয়ে তখন বয়ে যাচ্ছে কালনী নদী। এই অভিজ্ঞতা তুলনাবিহীন।